ভূমিকা
সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়: "আরবিতে ১ কোটি ২৩ লাখ শব্দ, আর ইংরেজিতে মাত্র ৬ লাখ!" কথাটি শুনতে চমৎকার, কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস ও গবেষণা না জানলে আমরা অজান্তেই একটি ভুল তথ্য ছড়াতে পারি।
সত্য হলো, "আরবিতে শব্দ কতটি?" প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। উত্তর নির্ভর করে আমরা "শব্দ" বলতে কী বোঝাচ্ছি তার ওপর: মূলধাতু, অভিধানের ভুক্তি, নাকি প্রতিটি রূপান্তরিত রূপ। চলুন ধাপে ধাপে দেখি।
১. আগে বুঝি: "শব্দ" গোনা হয় কীভাবে?
আরবি শব্দভাণ্ডার বুঝতে তিনটি পরিভাষা জানা জরুরি:
পরিভাষা অর্থ উদাহরণ جِذْرٌ (জিযর)মূলধাতু, সাধারণত তিন বর্ণের ك - ت - بمَادَّةٌ (মাদ্দাহ) অভিধানে একটি মূলধাতুর অধীনে পুরো শব্দ-পরিবার كَتَبَ ، كَاتِبٌ ، كِتَابٌ ، مَكْتَبَةٌ ...مَدْخَلٌ (মাদখাল)অভিধানের একক ভুক্তি বা এন্ট্রি مَكْتَبَةٌ — লাইব্রেরি
একটি মাত্র মূলধাতু থেকে অনেক শব্দ জন্ম নেয়:
كَتَبَ — সে লিখেছে
كَاتِبٌ — লেখক
كِتَابٌ — বই
مَكْتَبٌ — অফিস, ডেস্ক
مَكْتَبَةٌ — লাইব্রেরি
مَكْتُوبٌ — লিখিত, চিঠি
আবার শুধু كَتَبَ ক্রিয়াটিরই অতীত, বর্তমান, আদেশ, কর্তা-কর্মভেদে অসংখ্য রূপ হয় (যেমন كَتَبْتُ "আমি লিখেছি", يَكْتُبُونَ "তারা লেখে")। প্রতিটি রূপকে আলাদা শব্দ ধরলে সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ কারণেই বিভিন্ন উৎসে সংখ্যার এত পার্থক্য।
২. "১ কোটি ২৩ লাখ শব্দ" দাবির উৎস কোথায়?
এই সংখ্যার শিকড় আরবি অভিধানশাস্ত্রের জনক খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি (মৃ. ১৭০ হি.) এবং তাঁর অভিধান "كِتَابُ الْعَيْنِ"-এর সাথে যুক্ত। তিনি আরবি বর্ণগুলোর সম্ভাব্য সব বিন্যাস (تَقْلِيبَاتٌ) হিসাব করে কোন বিন্যাস ব্যবহৃত (مُسْتَعْمَلٌ) আর কোনটি অব্যবহৃত (مُهْمَلٌ) তা চিহ্নিত করার পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন।
পরবর্তীকালে ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (মৃ. ৯১১ হি.) উল্লেখ করেন যে খলিল দুই, তিন, চার ও পাঁচ বর্ণের ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত সব মূলধাতু গুনে মোট ১,২৩,০৫,৪১২টি সংখ্যায় পৌঁছেছিলেন, যদিও কীভাবে গুনেছেন তা বলা হয়নি। সুয়ুতির এই বর্ণনা তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ "الْمُزْهِرُ فِي عُلُومِ اللُّغَةِ"-তে পাওয়া যায়। arxiv
এখানেই মূল বিষয়টি লুকিয়ে আছে। এই সংখ্যায় ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত দুই ধরনের বিন্যাসই আছে। অর্থাৎ এটি আরবির বাস্তব শব্দসংখ্যা নয়, বরং তাত্ত্বিকভাবে সম্ভাব্য বর্ণবিন্যাসের সংখ্যা। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২৮টি বর্ণ থেকে তিন, চার ও পাঁচ বর্ণের সম্ভাব্য সব সমন্বয় হিসাব করেই এই সংখ্যা এসেছে, যার অনেকগুলোরই কোনো নির্ধারিত অর্থ নেই। eliteasia
আরও লক্ষণীয়, একটি গবেষণাপত্রের লেখক জানিয়েছেন, খলিলের নামে প্রচলিত এই উক্তিটি তিনি "কিতাবুল আইন"-এর ভূমিকায় খুঁজে পাননি, অর্থাৎ সংখ্যাটি পরবর্তী বর্ণনার মাধ্যমে প্রচারিত। arsco
সারকথা: ১,২৩,০৫,৪১২ একটি গাণিতিক সম্ভাবনার হিসাব, আরবির ব্যবহৃত শব্দের তালিকা নয়।
৩. ক্লাসিক্যাল অভিধানগুলো কী বলে?
আরবির বিখ্যাত অভিধানগুলোতে সংখ্যা গোনা হয় مَادَّةٌ (মূলধাতুভিত্তিক ভুক্তি) হিসেবে:
অভিধানলেখকভুক্তি সংখ্যা الصِّحَاحُ (আস-সিহাহ)আল-জাওহারিপ্রায় ৪০,০০০ মাদ্দাহ الْقَامُوسُ الْمُحِيطُ (আল-কামুসুল মুহিত)আল-ফিরোজাবাদি (মৃ. ৮১৭ হি.)প্রায় ৬০,০০০ لِسَانُ الْعَرَبِ (লিসানুল আরব)ইবনে মানযুর (মৃ. ৭১১ হি.)প্রায় ৮০,০০০ মাদ্দাহ
"লিসানুল আরব"-এ প্রায় ৮০ হাজার মাদ্দাহ রয়েছে, যা আস-সিহাহ-এর দ্বিগুণ এবং পরবর্তী অভিধান আল-কামুসুল মুহিতের চেয়ে ২০ হাজার বেশি। আল-কামুসুল মুহিতে প্রায় ষাট হাজার শব্দের ব্যাখ্যা রয়েছে। archivehuggingface
মনে রাখতে হবে, প্রতিটি مَادَّةٌ-এর ভেতরে অনেকগুলো শব্দ থাকে। তাই প্রকৃত শব্দসংখ্যা এই সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
৪. আরবিতে মূলধাতু কতটি?
মূলধাতুর সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের অনুমান ভিন্ন:
ভাষাবিদ ক্যারেন রাইডিং তাঁর “A Reference Grammar of Modern Standard Arabic” গ্রন্থে আরবিতে ৫,০০০ থেকে ৬,৫০০ মূলধাতুর কথা বলেছেন। arabiconline
আধুনিক মু'জামুদ দোহা-র কাজে প্রায় ১০ হাজার মূলধাতু এবং এক বিলিয়নেরও বেশি শব্দের পাঠসংগ্রহ (করপাস) ব্যবহৃত হয়েছে। noonpost
পার্থক্যের কারণ হলো, একটি গবেষণা শুধু আধুনিক প্রমিত আরবিতে প্রচলিত ধাতু গোনে, অন্যটি প্রাচীন থেকে আধুনিক সব যুগের ধাতু অন্তর্ভুক্ত করে।
৫. সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় গবেষণা: মু'জামুদ দোহা আত-তারিখি
আরবি শব্দভাণ্ডার নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত কাজ হলো কাতারের "مُعْجَمُ الدَّوْحَةِ التَّارِيخِيُّ لِلُّغَةِ الْعَرَبِيَّةِ" (আরবি ভাষার দোহা ঐতিহাসিক অভিধান)।
২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর দোহায় এই অভিধানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। islamonline
২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প বিশ শতাব্দী জুড়ে আরবি শব্দের ইতিহাস ও অর্থের পরিবর্তন নথিভুক্ত করেছে। aljarida
প্রকল্পের প্রধান আযমি বিশারার বিবরণ অনুযায়ী, এর ভুক্তির সংখ্যা ৩ লাখে পৌঁছেছে, যার মধ্যে শিলালিপি ও বিভিন্ন পাঠ থেকে সংগৃহীত ভুক্তি এবং সেমিটিক ভাষাগুলোর সমগোত্রীয় ধাতুও রয়েছে। almodon
এর মূল পাঠসংগ্রহে প্রায় ৬০ কোটি শব্দ রয়েছে, সাথে প্রায় ৪০ কোটি শব্দের একটি আধুনিক সংযুক্ত পাঠসংগ্রহ। almodon
এখানে সতর্কতা: ৬০ কোটি বা ১০০ কোটি হলো পাঠসংগ্রহে মোট শব্দের ব্যবহারসংখ্যা (একই শব্দ বারবার এলে প্রতিবার গোনা), স্বতন্ত্র শব্দের সংখ্যা নয়।
৬. তাহলে আসল উত্তর কী?
সব গবেষণা একত্র করলে চিত্রটি এমন দাঁড়ায়:
কী গোনা হচ্ছেআনুমানিক সংখ্যাউৎসতাত্ত্বিকভাবে সম্ভাব্য বর্ণবিন্যাস (ব্যবহৃত + অব্যবহৃত)১,২৩,০৫,৪১২খলিলের নামে সুয়ুতির বর্ণনামূলধাতু (জিযর)৫,০০০ – ১০,০০০রাইডিং; মু'জামুদ দোহাক্লাসিক অভিধানের মাদ্দাহ৬০,০০০ – ৮০,০০০আল-কামুস; লিসানুল আরবঐতিহাসিক অভিধানের ভুক্তিপ্রায় ৩,০০,০০০মু'জামুদ দোহা
উপসংহার: আরবিতে কার্যত ব্যবহৃত মূলধাতু কয়েক হাজার, আর সেগুলো থেকে তৈরি শব্দভাণ্ডার কয়েক লাখ। "১ কোটি ২৩ লাখ শব্দ" দাবিটি বাস্তব শব্দসংখ্যা নয়, বরং বর্ণবিন্যাসের একটি তাত্ত্বিক হিসাব।
ইংরেজির সাথে তুলনাও সতর্কভাবে করা উচিত, কারণ দুই ভাষার শব্দ গোনার পদ্ধতি এক নয়। ইংরেজিতে write, writer, writing আলাদা ভুক্তি, আর আরবিতে সেগুলো প্রায়ই একই مَادَّةٌ-এর অধীনে থাকে।
৭. তাহলে আরবির সমৃদ্ধি কোথায়?
সংখ্যা অতিরঞ্জিত হলেও আরবির সমৃদ্ধি বাস্তব। এর প্রকৃত শক্তি হলো:
ক) ধাতু-ওজন পদ্ধতি (الِاشْتِقَاقُ): একটি ধাতুকে বিভিন্ন ওজনে বসিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করা যায়। যেমন ع - ل - م থেকে:
عَلِمَ — সে জেনেছে
عَلَّمَ — সে শিখিয়েছে
تَعَلَّمَ — সে শিখেছে
عَالِمٌ — জ্ঞানী
مُعَلِّمٌ — শিক্ষক
مَعْلُومَاتٌ — তথ্য
খ) সূক্ষ্ম অর্থভেদ: কাছাকাছি অর্থের শব্দগুলোর মধ্যেও সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। যেমন جَلَسَ ও قَعَدَ দুটোই "বসা", কিন্তু ভাষাবিদদের মতে جَلَسَ সাধারণত শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসা, আর قَعَدَ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসা বোঝায়।
গ) নতুন শব্দ তৈরির সক্ষমতা: আধুনিক প্রযুক্তির জন্যও আরবি নিজের ধাতু থেকে শব্দ বানাতে পারে। যেমন ح - س - ب (হিসাব করা) থেকে حَاسُوبٌ (কম্পিউটার)।
শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা
লক্ষ লক্ষ শব্দের কথা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দৈনন্দিন যোগাযোগ ও সাধারণ পাঠ বোঝার জন্য কয়েক হাজার বহুল ব্যবহৃত শব্দই যথেষ্ট। আর মূলধাতু পদ্ধতির কারণে একটি ধাতু শিখলেই অনেকগুলো শব্দ একসাথে চেনা যায়।
اَلْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ.
"জ্ঞান অর্জিত হয় শেখার মাধ্যমে।"
আন নাফে একাডেমির কোর্স ও বইগুলোতে এই মূলধাতু পদ্ধতিতেই শব্দভাণ্ডার শেখানো হয়, যাতে অল্প পরিশ্রমে বেশি শব্দ আয়ত্ত করা যায়।
তথ্যসূত্র
প্রাচীন উৎস (মূল গ্রন্থ):
আল-খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি, كِتَابُ الْعَيْنِ, তাহকিক: মাহদি আল-মাখযুমি ও ইবরাহিম আস-সামাররাই, দার ও মাকতাবাতুল হিলাল। (আল-মাকতাবা আশ-শামিলা)
জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি, الْمُزْهِرُ فِي عُلُومِ اللُّغَةِ وَأَنْوَاعِهَا।
ইবনে মানযুর, لِسَانُ الْعَرَبِ। (আল-মাকতাবা আশ-শামিলা)
আল-ফিরোজাবাদি, الْقَامُوسُ الْمُحِيطُ।
আধুনিক গবেষণা ও প্রতিবেদন:
5. Karen C. Ryding, A Reference Grammar of Modern Standard Arabic, Cambridge University Press, 2005।
6. “Build Electronic Arabic Lexicon”, arXiv:1311.6045। (লিংক)
7. আহমাদ আরফিস, "اللغة العربية بعيون رياضية: عدد الأبنية المستعملة"। (লিংক)
8. আযমি বিশারা, "نحو إعلان اكتمال معجم الدوحة التاريخي للغة العربية", আল-মুদুন, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫। (লিংক)
9. আল-জারিদা, "الفريح: معجم الدوحة... ثراء يرسخ مكانة العربية"। (লিংক)
Kabir, দুটি বিষয় জানিয়ে রাখি। আস-সিহাহ-এর "প্রায় ৪০,০০০" সংখ্যাটি লিসানুল আরবকে আস-সিহাহ-এর দ্বিগুণ বলার তথ্য থেকে হিসাব করা। আর جَلَسَ / قَعَدَ এর পার্থক্যটি ফিকহুল লুগাহ-র প্রসিদ্ধ মত, তবে সব ভাষাবিদ এতে একমত নন। প্রকাশের আগে চাইলে এই দুটি পয়েন্টের সাথে নির্দিষ্ট গ্রন্থের পৃষ্ঠা নম্বর যোগ করে নিতে পারেন।
Sources:




